ভ্যাট ও শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব যথার্থভাবে মূল্যায়ন না করায় সরকারের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হবে না। বরং এতে ভোগ কমে যাবে, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে ও মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়বে। জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। গতকাল ‘ভোক্তার কাঁধে বাড়তি করের বোঝা: উত্তরণে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এমন অভিমত দেন বক্তারা।
এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সার্ভিসকে কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, সে তথ্যগুলো উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তাহলে আমরা বুঝতে পারব কর সুবিচার হয়েছে কিনা। রাজস্ব বাড়াতে সরকার সহজ পথ হিসেবে ভ্যাট আরোপকে বেছে নিয়েছে। ইনফরমাল বিজনেস এখনো করের বাইরে। রাজস্ব আদায় কেন বাড়ছে না। ডিজিটালাইজেশনে কেন আগ্রহ নেই। দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের আয় কোটি টাকার বেশি হলেও তারা করজালে নেই। তাদের ট্যাক্সের মধ্যে আনতে হবে। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ দরকার।
সম্প্রতি শতাধিক পণ্য ও সেবায় শুল্ক-কর বাড়িয়ে সরকার দুর্নামের অংশীদার হয়েছে বলে মন্তব্য করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেয়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য থেকে গত ছয় মাসে ৮৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি আছে। আইএমএফ চাপ দিচ্ছে রাজস্ব বাড়াতে। তাই করজাল না বাড়িয়ে সরকার পরোক্ষ কর বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।’
সিপিডির গবেষণা পরিচালক বলেন, ‘রাজস্ব বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের অন্য কোনো বিকল্প ছিল কিনা তা দেখতে হবে। কারণ শতাধিক পণ্য ও সেবায় শুল্ক-কর বাড়ানোয় ১১ হাজার বা সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব পাওয়া যাবে বলা হয়েছে। এতে রাজস্বের ঘাটতি তেমন একটা পূরণ হবে না।’
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি অনেকটাই স্থবির হয়ে গেছে। আমরা সফলতা আনতে পারিনি, ফলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।’
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘এসআরও নামে এনবিআরের কাছে একটা অস্ত্র আছে। এটা অপপ্রয়োগই বেশি হয়। আইএমএফের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে ব্যর্থ হয়ে সম্প্রতি ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। আমাদের দেশেও ভ্যাট সিঙ্গেল রেটে আনতে হবে।’
অর্থনীতিবিদ এমএম আকাশ বলেন, ‘নিত্যপণ্যে শুল্ক কমিয়ে দ্রব্যমূল্য কমেনি। বরং রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। তারপর ভ্যাট দিয়ে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। ভ্যাট আরোপ না করে উপায় ছিল না সরকারের। এতে সরকারের আরো বিপদ বাড়বে।
কর-ভ্যাটের হার যুক্তিযুক্ত করা হলে দেশ সুন্দরভাবে চলবে বলে মন্তব্য করেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দেশকে এগিয়ে নিতে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়াতে ব্যবসায়ীদের দরকার আছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ বাড়াতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি এমএ হাশেম, বাংলাদেশ অটো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুর রহমান ভূঁইয়া, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি এবং রিভারস্টোন ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আশরাফ আহমেদ, এসিআই ফুডস অ্যান্ড কমোডিটি ব্র্যান্ডসের চিফ বিজনেস অফিসার (সিবিও) ফারিয়া ইয়াসমিন, এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফ উদ্দিন নাসির, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল ও রাজীব চৌধুরী, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আকতার মালা ও সাবেক ব্যাংকার সাইফুল হোসেন।